Mamata Banerjee

‘১০ লক্ষ‍ের নাম বাদ পড়বে অতিরিক্ত ভোটার তালিকায়’, দাবি মুখ্যমন্ত্রীর, বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তেহার প্রকাশ করলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আমলা বা পুলিশকর্তার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অভিযোগ থাকতে হয়। তা ছাড়া যাঁরা নির্বাচনের কাজে যুক্ত থাকেন, তাঁদের বদলি হয়। কিন্তু ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটের আগে যে ভাবে একের পর এক আমলা এবং পুলিশকর্তার বদলি করা হচ্ছে, তাতে রাজ্য বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২০ মার্চ ২০২৬ ১০:১৪

শুক্রবার তৃণমূলের ইস্তেহার প্রকাশের কর্মসূচি ছিল। সেই কর্মসূচিতে ৬০ লক্ষ বিবেচনাধীন অর্থাৎ 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন' ভোটারদের প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন৷ তিনি জানান, তাঁর কাছে ৬০ লক্ষ বিবেচনাধীন ভোটারের মধ্যে এখনও পর্যন্ত প্রায় ২২ লক্ষ ভোটারের নিষ্পত্তি হয়েছে। সেই ২২ লক্ষ ৬০ হাজার ভোটারের মধ্যে ১০ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়বে বলে জানতে পেরেছেন তিনি। তাঁর কথায় “মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও দুই দিনাজপুরে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ একটি সম্প্রদায়ের পাশাপাশি হিন্দু, মতুয়া ও রাজবংশী মানুষও বাদ যাচ্ছেন।” কমিশনের তথ্য বলছে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২৫ লক্ষের বেশি নামের নিষ্পত্তি হয়েছে, তবে তালিকা প্রকাশ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। মমতার প্রশ্ন, “ভোটের আগে এই কাজ আদৌ শেষ হবে তো?”

বিধানসভা নির্বাচনের মুখে 
ভোটার তালিকা সংশোধন এবং আমলা বদলি নিয়ে বিরোধী পক্ষকে মুখ্যমন্ত্রী নজিরবিহীন আক্রমণ শানালেন। তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচনের সময় কিছু আধিকারিককে বদলি করা হয়েই থাকে। সেটা নির্বাচন কমিশন করতে পারে। কিন্তু সেখানে সীমাবদ্ধতা আছে।’’ মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আমলা বা পুলিশকর্তার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অভিযোগ থাকতে হয়। তা ছাড়া যাঁরা নির্বাচনের কাজে যুক্ত থাকেন, তাঁদের বদলি হয়। কিন্তু ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটের আগে যে ভাবে একের পর এক আমলা এবং পুলিশকর্তার বদলি করা হচ্ছে, তাতে রাজ্য বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘মানুষ খাদ্য পাবে কোথা থাকে? রেশন বন্ধ হয়ে গেলে যেন আমাকে দোষ দেবেন না। আমি তো রেশন দিতে চাই। কিন্তু এখানকার ফুড ডিপার্টমেন্টের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিকে নিয়ে গিয়েছে অবজ়ার্ভার করে। কখনও শুনেছেন? এঁরা নির্বাচনের কাজে যুক্ত ছিলেন না। এরা উন্নয়নের কাজের দেখাশোনা করতেন। পঞ্চায়েত দফতরের আধিকারিককে বলছে নির্বাচনী পর্যবেক্ষক হয়ে যেতে! ঝড়-জলে রাস্তা ভেঙে গেলে, দুর্যোগ হলে পিডব্লিউডি-প্রিন্সিপাল সেক্রেটারির বড় ভূমিকা থাকে। তাঁকেও অবজার্ভার করে নিয়ে চলে যাওয়া হয়েছে।’’

এদিন ইস্তেহার প্রকাশের সময় মুখ্যমন্ত্রী জানান, তিনি শুনেছেন রাজ্যের আরও কয়েক জন আধিকারিককে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে ভিন্‌রাজ্যে। তাঁদের বদলে যাঁদের আনা হচ্ছে, তাঁদের পশ্চিমবঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই। মমতা অভিযোগের সুরে বলেন, ‘‘তাঁরা এখানকার মানুষকে চেনেন না, এখানকার ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি জানেন না। নির্বাচনী বুথ, ব্লক, জেলা সম্পর্কে ধারণা নেই। কে দেখবে এ সব?’’ তিনি আরোও বলেন, ‘‘তার পর যদি কোনও ঘটনা ঘটে, এ জন্য দায়ী থাকবে বিজেপি সরকার। কারণ, নির্বাচন কমিশন বিজেপি সরকারের বাইরে নয়। তাদের তোতাপাখি।’’ তার পর কেন্দ্রীয় সরকারকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘‘লজ্জা! প্রেসিডেন্ট রুল করে মোদীজিকে বাংলায় নির্বাচন করাতে হচ্ছে! বাংলার মানুষকে এত ভয়!’’

তিনি দলের ইস্তাহার প্রকাশের কর্মসূচি থেকে মূলত তিনটি ‘নয়া’ অভিযোগ করলেন। প্রথমেই বিবেচনাধীন ভোটারের ‘ভাগ্য’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার পর রাজ্য ভাগের পরিকল্পনা চলছে বলে অভিযোগ করে তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়ে গিয়েছে! শুক্রবার রাজ্যের বিবেচনাধীন ভোটারদের তথ্য যাচাইয়ের পর সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের কথা ছিল। কিন্তু দুপুর পর্যন্ত শুক্রবার সেই তালিকা প্রকাশিত না হওয়ায়, সংশয় প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘এই করে করে দিনগুলো নষ্ট করছে।’’

নির্বাচন কমিশন সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার অব্দি ২৫ লক্ষ ৩৪ হাজার ভোটারের তথ্যের নিষ্পত্তি হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালরা বৈঠক করেন৷ তবে তালিকা প্রকাশ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি বলেই জানা গিয়েছিল। শুক্রবার মমতার সংশয়, ‘‘ভোটের আগে নিষ্পত্তির কাজ শেষ হবে কি না, কে জানে!’’

মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, বিজেপির অনেক দিনের ‘টার্গেট’ পশ্চিমবঙ্গকে এ বার যে ভাবে হোক দখল করতে হবে। সে জন্য রাজ্যকে ভাগ করারও কথা চলছে! তিনি বলেন, ‘‘ওদের প্ল্যান আছে, উত্তরবঙ্গ বাদ দিয়ে বিহারের কিছু অংশ নিয়ে আবার নতুন রাজ্য তৈরি করার।’’ পাশাপাশি তিনি আরোও বলেন, ‘‘এ দেশে সংবিধান, আইন সব কিছু মোদী সরকার কিনে নিয়েছে।’’ এর পরেই নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করে বলেন, ‘‘আমরা শুনেছি, এই ভোটের পরে আবার ‘ডিলিমিটেশন’ করবে। আগামী বার মোদী সরকার জিতবে না। ক্ষমতায় আসবে না। তাই ‘ডিলিমেটেশন’, এনআরসি এবং সেন্সাসের নাম করে আরও মানুষের নাম বাদ দেওয়াই ওদের পরিকল্পনা।’’

পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যের জবাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শমীক ভট্টাচার্য। বিজেপির রাজ্য সভাপতির দাবি, ‘‘মানুষের কাছে গেলে তাঁরা প্রশ্ন করছেন, রাজ‍্যে এই সরকারটা এখনও আছে কেন? কেন ফেলে দেওয়া হচ্ছে না? আমরা মানুষকে বোঝাতে পারছি না যে, আমরা কংগ্রেসি নই, ৩৫৬ ধারা জারি করে নির্বাচিত সরকার ফেলে দেওয়া আমাদের ডিএনএ-তে নেই।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী বার বার রাষ্ট্রপতি শাসনের কথা বলছেন, কারণ তিনি শহিদ হতে চাইছেন। তিনি মাটি চেনেন। তিনি বুঝতে পারছেন, নির্বাচনে কিছুতেই জিততে পারবেন না। তাই এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছেন, যাতে ৩৫৬ ধারা জারি হয়ে যায়। আর তিনি নিরাপদে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে দিল্লি গিয়ে বলতে পারেন, আমার সরকারটাকে ফেলে দিল।’’


Share